Comments
- riton on একলা লাগে – ফাহমিদা নবী ও রূপঙ্কর
- সোমপ্রতিম on একলা লাগে – ফাহমিদা নবী ও রূপঙ্কর
জীবনানন্দ দাশ
জীবন ছাড়িয়ে কোনো মানবীয় অভিজ্ঞতা থাকা কি সম্ভব? কবির অভিজ্ঞতা যা আকাশ-পাতাল সমস্তই উপলব্ধি করে নিতে চায় তাও তো মানবীয়। অবশ্য এরকম কবি আছেন_ বা কাব্যনিয়তির পথে এমন সব মুহূর্ত মাঝে মধ্যে এসে পড়ে যখন মনে হয় কবির ভাব-প্রতিভা এমন এক অপরূপ অপ্রশান্তির আস্বাদ পেয়েছে, যা জীবনের কোনো ব্যবহারের ভেতরেই ধরা পড়ে না, জীবনের প্রতিবিম্বও নয়, আমাদের এই ইতিহাসসম্মত জীবন ছাড়িয়ে কবিমানসের কোনো অনন্য অভিজ্ঞতার দেশে চলে গিয়েছে। কোনো কবি যদি এরকম মনে করেন তাহলে বুঝতে হবে যে তিনি কালকের বা আজকের নিত্য ব্যবহার্য সমাজপদ্ধতির বাইরে কোনো কিছুর কথা ভাবছেন, কিন্তু তবুও জীবনের বাইরে কোথাও চলে যেতে পারেননি। কারণ জীবন,_ এই জীবনের পদ্ধতি যে কোনো সমাজ ও সমবায় পদ্ধতির চেয়ে বড়, এরই ভিতরে মানুষের সমবায়-ব্যবস্থা বারবার ভেঙে যাচ্ছে ও নতুনভাবে গড়ে উঠছে। আমাদের এই গ্রহের জীবনসাক্ষ্যের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃষ্টান্ত মানুষ; কোনো বিস্ময়কর প্রমত্ততার মুহূর্তেও নিজেকে অন্যরূপ কল্পনা করা তার পক্ষে কঠিন; তার কল্পনাপ্রতিভার চমৎকার সংহতির মুহূর্তে মানবজীবন সম্পর্কে সবচেয়ে মূল্যবান কথা আবিষ্কার করবার কিংবা নতুনভাবে প্রচার করবার সুযোগ সে পায়। এইসব সময়ই হচ্ছে কাব্য বা শিল্প সৃষ্টির সময়।
যাঁরা মনে করেন কবিতা যে কোনো সময় সৃষ্ট হতে পারে কারণ কবিতা সমীচীন গদ্য বা ভূয়োদর্শী সম্পাদকীয় মন্তব্যের মতোই,_ কবিতা সম্পর্কে তাদের ধারণা অন্য রকম হবে। তাঁদের মতো হয়তো মানুষের ভূয়োদর্শী মনই কবিতা রচনা করে যেতে পারবে- গদ্যে কি পদ্যে,_ এবং সে কবিতার ভাষা ও অর্থে কোনো দিব্য ইঙ্গিত বা দিবাতার স্পর্শ থাকবে না কিংবা থাকা অবান্তর বা অপরাধ।
থাকা অপরাধ। তাদের কারও হয়তো এই মত। অনেক স্থলেই তাই দেখেছি সৎ সম্পাদকীয় উক্তিই যেন কবিতা। কিন্তু কবিতা বাস্তবিকই কি তাই? যে কোনো সুস্থ ও সমীচীন মানুষ অসুস্থ বা অন্যবিধ সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওই রকমের মন্তব্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন,_ এবং অহরহ করে যেতে পারেন। এর জন্য আত্মভ্রষ্ট হৃদয়াবেগ ও কল্পনা-প্রতিভাকে সুনিয়ন্ত্রিত করার মতো কোনো বিশেষ সুযোগ বা প্রতীক্ষার দরকার আছে বলে মনে হয় না। কারণ তাদের মতে কাব্য রচনা সম্পর্কে ভাবনা,_ প্রতিভা ও হৃদয়াবেগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
কবিতা লেখার কাজ খুব উন্নতভাবে সম্পন্ন করবার পক্ষে রচয়িতার সচেতন জীবনদর্শী মন ও সেই মনোভাব ভাষায় প্রকাশ করবার মতো লিপিকুশলতাই যথেষ্ট। কিন্তু এই দুটি জিনিসের উৎকৃষ্ট সামঞ্জস্যে যে সুলিপি প্রবর্তিত হয় কবিতা কি তা ছাড়া অন্য কিছু? আমার মনে হয়, এই সুলিপি সত্যই খুব ভালো জিনিস। কিন্তু সুসমাচারের মতো এই সুলিপি_ এই সমস্ত জিনিসকেই অবান্তর করে দিয়ে কবিতা নিজের চরিত্রবলে নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। পূর্বজ কবিরা একে মনে করতেন মায়াবল। অতটা সাহস আমার নেই। আমি একে কবিতার চরিত্রবল বলে অভিহিত করেছি। যে কোনো রচনা সৌষ্ঠবকে অপ্রাসঙ্গিকতায় পরিণত করে দু-একটা লাইন, কয়েকটি লাইন কিংবা সম্পূর্ণ একটি জিনিস অবিসংবাদীভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে কবিতা হয়।
কবিতার সংজ্ঞা ও কবিতা পাঠ সম্পর্কে ধারণার স্পষ্টতা লেখক ও পাঠক উভয় শ্রেণীর ভেতরেই সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে দেখা দেবে_ এ আশা স্পষ্টভাবে পোষণ করবার মতো কোনো উৎসাহ অভিজ্ঞ মানবের হৃদয়ে আজ হয়তো নেই। কিন্তু সে আশা যাতে চিরকালই ছলনার মতো না থেকে যায় সে জন্য আধুনিক লেখকরা আবার অবহিত হয়ে উঠছেন।
লেখক হিসেবে আমিও অবহিত হয়তো,_ কিন্তু অসমর্থ। আমার সৃষ্টিপন্থাও সূর্য ও তপতীকে আশ্রয় করে; হয়তো তপতীকেই অবলম্বন করেছি বেশি_ কোনো এক ভবিষ্যৎ বিশেষ করে সূর্যাশ্রয়ী হবার জন্য। কবিতা কী,_ কী তার কাজ,_ কী করে কবিতা গ্রহণ করতে হবে,_ এসব জিজ্ঞাসা সম্পর্কে কবি ও পাঠকের ধারণা ক্রমশই আরো পরিচ্ছন্ন না হলে উভয়পক্ষই অস্বস্তি বোধ করবেন। আমার এবং যাদের আমি জীবনের পরিজন মনে করি তাদের অস্বস্তি বিলোপ করে দিতে না পেরে, জ্ঞানময় করবার প্রয়াস পাই এই কথাটি প্রচার করে যদি ভাবা যায় যে কবিতা মানুষের আধুনিক জীবনকে নিরন্তর ভবিষ্যতের শ্রেয়তর সামাজিক জীবনে পরিণত করে চলেছে তাহলে সে ধারণা ঠিক হবে না।
কবিতার ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে বুঝে নিতে পারা যায় যে কবিতা মানুষের জীবনের কল্যাণমানসকে অপরোক্ষভাবে চরিতার্থ করার সুযোগ না দিয়ে বরং জীবনের স্বর্গ ও আঘাটা সবেরই ভয়াবহ স্বাভাবিকতা ও স্বাভাবিক ভীষণতা আমাদের নিকটে পরিস্ফুট করে; আমাদের হৃদয়, ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৎ কী অসৎ পরিণতির পথে কৃষ্ণপক্ষের সূর্যের মতো [ভেবে নেওয়া যাক] উপস্থিত হয়; আমাদের জ্ঞানপিপাসু স্বভাবকে সর্বতোভাবে সব কথা জানিয়ে দেবার চেষ্টা করে; আমাদের ভাবনাকে সর্বমানবীয় পরিসর দেয়; অভিজ্ঞতার আত্মপ্রসাদের ভিতর আত্মনাশ ও সকলের সর্বনাশ রয়েছে জানিয়ে দিয়ে তাকে মহত্তরভাবে গ্গ্নানিহীন করে দিতে চায়; হৃদয়কে ক্রমশই বিশুদ্ধ করে। এই করে এবং এই সমস্ত করে বলেই আমাদের গতি-পরিণতির কাহিনী নিয়েই কবিতা; পরিণতিশীল জীবনকে পূর্বোক্ত উপায়ে সজাগ ও শালীন করে তোলার ভার কবিতার ওপর।
কিন্তু তবুও কবিতার ওপর বাস্তবিক কোনো ভার নেই। কারো নির্দেশ পালন করবার রীতি নেই কবিমানসের ভেতর কিংবা তার সৃষ্ট কবিতায়। অথচ সৎ কবিতা খোলাখুলিভাবে নয়, কিন্তু নিজের স্বচ্ছন্দ সমগ্রতার উৎকর্ষে শোষিত মানবজীবনের কবিতা, সেই জীবনের বিপ্লবের ও তৎপরবর্তী শ্রেষ্ঠতর সময়ের কবিতা। মহৎ কবির ভাবনা সূক্ষ্ম, হৃদয় আন্তরিক [আশা করা যেতে পারে], অভিজ্ঞতা সজাগ ও চেতনা-অবচেতনা ঐকান্তিকভাবে সক্রিয় থাকার দরুন ব্যবহারিক পৃথিবীতে এরকম মানুষের কাছ থেকে জীবনের উন্নতিশীল ভাঙা-গড়ার কাজে শুভ ও সার্থক আত্মনিয়োগ দাবি করা যেতে পারে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় কবিতা ও শিল্পসৃষ্টির ভেতরেই তিনি ঢের বেশি স্বাভাবিক ও স্মরণীয়_ এমনকি অধিকতর মহৎ,_ বাস্তব কার্য ক্ষেত্রে তেমন নন।
এ রকম উক্তি করতে গিয়ে আমি সত্যই আত্মবিস্মৃত কি-না তা সমসাময়িক কবি বন্ধুরা বিচার করে দেখবেন।
আমার মনে হয়, উপরোক্ত বিষয় অনুভব করে আমি লিখি। কিন্তু কবিতা বা সাহিত্যই শুধু নয়, সুলিপি সৃষ্টি করবার জন্যও [এসবই ব্যক্তিগত প্রয়াস ও আকাঙ্ক্ষার কথা, সফলতার কথা নয়] লেখা প্রয়োজন মনে করি।
আজকের দুর্দিনে মানুষের নিঃসহায়তার রূপ কী রকম, কী করে তা কাটিয়ে উঠে জীবনের শুভ অর্থবোধ করতে পারা যায়_ এসব বিষয় নিয়ে যে কোনো প্রবীণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তার লিপিময় প্রকাশ মূল্যবান জিনিস। যদিও একথা স্বীকার করে নিতে হবে যে, অগণন কবিমনীষীর সৎ জীবননির্দেশের সমুদ্র আমাদের হৃদয়ের কাছে থাকতেও তা প্রায়শই আমাদের জন্য লবণাক্ত হয়ে রয়েছে। এবং তার পাশেই ছড়িয়ে রয়েছে জীবনের অন্নপূর্ণা মরীচিকা,_ তবুও তাতে এ জিনিস প্রমাণিত হয় না যে, কবিতা ও সাহিত্য ও সুলিপির ইতিহাস বিশ্ব মানুষের ভাবনা ও চেতনাকে মূল্যজ্ঞানময় ও চরিত্রবান করে তোলেনি।
শোষিত মানবজীবনের, সেই জীবনোৎসারিত বিপ্লবের ও সেই বিপ্লবের শেষে আশা-ভরসার সমাজের কবিতা ছাড়াও আরও অনেক কিছু নিয়েই কবিতা মহৎ হয়ে ওঠে। কিন্তু সে সমস্ত কাজও সময়, দেশ, প্রকৃতি ও প্রেমের ঐকান্তিক জিনিস হয়েও কেবলি শ্রুয়মান, ধ্যেয়মান ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন সম্পর্কে সচেতন ও অভিজ্ঞ,_ ও এই অভিজ্ঞতা_ এই সুজাতার থেকেই উৎসারিত।
জীবনানন্দ দাশ সমগ্র থেকে সংগ্রহীত
0 comments Add a comment