হাজার বছরের বাঙালি ও বাংলার উৎসব – নবান্ন উৎসব। কৃষি সভ্যতার ক্রমবিকাশের পর থেকেই আবহমান কাল ধরে গ্রামবাংলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়ে আসছে এই উৎসব। পাশাপাশি প্রতি বছরই ইট-পাথরের এই নগরীতেও নবান্নর একটু পরশ খোঁজার চেষ্টা চলে। গ্রামবাংলার নবান্নের ঘ্রাণ এখানে না পৌঁছালেও শহুরে লোকজন নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয় অগ্রহায়ণের এই প্রথম দিনটিকে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে নবান্ন উৎসব ১৪১৫।
সরকারও এ দিনটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে এ বছর থেকে জাতীয় কৃষি দিবস হিসেবে পালন করছে। তবে বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এই দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি জানিয়ে আসছে।
ঢাকঢোল পিটিয়ে নবান্ন শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে মাটির সঙ্গে চিরবন্ধনযুক্ত এই উৎসব ইট-পাথরের নগরীতে খোঁজার চেষ্টা করেছেন ব্যস- নগরবাসী। গতকাল নানা ধরনের নাচ, গান, গ্রামবাংলার ঐহিত্যবাহী বাউল গান, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অগ্রহায়ণের এই দিনটিকে পালন করেছেন তারা। আর এরই মধ্য দিয়ে নাগরিক জীবনে একদিনের জন্য নবান্নের স্বাদ নিয়েছেন নগরবাসী। প্রতি বছরের মতো এবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় উৎসবের এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ। ‘নিজের গোলায় তুলবো ধান গাইবো গান, ভরবে প্রাণ’- এই স্লোগান নিয়েই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উদযাপন পর্ষদ। এই উপলক্ষে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয় বকুলতলায়। সকাল পৌনে ৭টায় ক্যাপ্টেন আজিজের বাঁশির সুরে শুরু হয় উৎসব। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রবীণ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। এরপর ঢাকঢোল পিটিয়ে বকুলতলা থেকে বের হয় নবান্নের বিশেষ শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার বকুলতলায় এসে মিলিত হয়।
সকালে নবান্নের গান পরিবেশন করেন মিতা হক, বিমল চন্দ্র বিশ্বাস, বিজন মিস্ত্রি, সালমা আকবর, সফিউল আলম রাজা, সন্দীপন, চন্দনা মজুমদার। এ ছাড়া রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, ধ্রুবতানও সঙ্গীত পরিবেশন করে।
কবিতা আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও লায়লা আফরোজ। স্পন্দন, নৃত্যম, নটরাজ ও নন্দনের নৃত্যশিল্পীরা নবান্নের মনোহর নৃত্য পরিবেশন করেন। পরে ‘রং তুলিতে নবান্ন’ শীর্ষক শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকঢোলের বাজনায় আবার মুখরিত হয়ে ওঠে বকুলতলা। এ সময় আবার দ্বিতীয় দফা সঙ্গীত, আবৃত্তি, কত্থক নৃত্য, বাউল গান শুরু হয়। উদীচী, খেলাঘর, ক্রানি-, ঋষিজ, মিরপুর আদিবাসী স্কুল, বহ্নি শিখা, সুকন্যা, ওস-াদ মমতাজ আলী খান একাডেমির সদস্যরা নৃত্য ও গান পরিবেশন করেন।
জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম ভোরের কাগজকে বলেন, প্রতি বছর আমরা বকুলতলায় নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে আসছি। এ বছর আমাদের এক দশক পূর্তি হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসের প্রাচীনতম অনুষ্ঠানগুলোর একটি হচ্ছে নবান্ন উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে জাতীয়ভাবে এ উৎসব পালন করা হয়। আমেরিকায় নতুন ফসলের আগমন উপলক্ষে প্রতি বছর নভেম্বরের তৃতীয় বৃহস্পতিবার ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস পালন করা হয়। অথচ আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য থাকার পরও আমরা এখনো নবান্ন উৎসবের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় করতে পারিনি। পয়লা অগ্রহায়ণকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালন করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
নবান্ন উৎসব উপলক্ষে বকুলতলায় শুধু নাচ,গান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজনই করা হয়নি, গ্রামবাংলার বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পায়েশ ও মুড়ি-মুড়কির মেলাও বসেছিল। এসব পিঠার মধ্যে ছিল পাটিশাপটা, ভাপা, চিতইসহ বিভিন্ন পিঠা।

