১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাস আগে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ প্রস্তাব করেন, ‘ভারতে যেমন হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হতে চলেছে, পাকিস্তানেও তেমনি উর্দু রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত’। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি লেখেন, ‘অধিকাংশ জনসংখ্যার ভাষা হিসেবে বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত, যদি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয় তখন উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।’
রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. কাজী মোতাহার হোসেন ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ওপর রাষ্ট্রভাষারূপে চালাবার চেষ্টা করা হয় তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধূমায়িত অসন্তোষ বেশিদিন চাপা থাকতে পারে না। শিগগিরই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্পর্কের অবসান হওয়ার আশঙ্কা আছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের পক্ষে সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি প্রথম উত্থাপন করে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ। তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ছিলেন বাংলাভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে প্রচারিত প্রস্তাবে দাবি করা হয় -
১। বাংলা ভাষাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা, পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা।
২। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি, উর্দু ও বাংলা ।
৩। বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রধান ভাষা, উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা। ইংরেজি হবে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আর্ন্তজাতিক ভাষা।
৪। শাসনকার্য ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাতত কয়েক বছরের জন্য ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসন কার্য চলবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলা ভাষার সংস্কার সাধন করতে হবে।
তথ্যসূত্র : ভাষা সৈনিক অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের বই ‘একুশ : ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস’
