হাসান ভাই ধন্যবাদ আবারো, সব সময় সত্য বলার জন্য। আমার ব্লগ যারা পড়েন, আশা করছি তারা আগ্রহ সহকারে পড়বেন হাসান ভাই এর এই লেখাটি।
পশ্চাতে রেখেছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে
আবু হাসান শাহরিয়ার
ইন্দ্রের বরে মঙ্গলকাব্যের বেহুলা মৃতস্বামী লখিন্দরকে জীবিত ফিরে পেয়েছিল। রোমান পুরাণের সাইকিও খুঁজে পেয়েছিল নিখোঁজ স্বামী ভেনাসপুত্র কিউপিডকে। ২৫ ফেব্রুারির পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে যারা স্বামীহারা হয়েছেন, তারা কাব্যলোকের বেহুলার কিংবা পুরাণের সাইকির ভাগ্য নিয়ে জন্মাননি। তাই “কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না” বলে মিডিয়ার ক্যামেরায় মর্মান্তিক কান্নায় ভেঙে পড়তে হয় নিখোঁজ ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনোভা হায়দারকে। পাশে অবুঝ দুই শিশুসন্তান। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই চোখ মুছেছেন ৩ মার্চ রাতে। সেনাকর্মকর্তা-পরিবারের নারীদের সঙ্গে বিডিআরের পথভ্রষ্ট জওয়ানদের অসদাচারণের কথা জানিয়েছেন তাসনোভা। শুধু তুইতুকারিই করেই ক্ষান্ত হয়নি ওরা, কোয়ার্টারগার্ডের গুমোট কক্ষে অবরুদ্ধ নারী-শিশুদের গাদাগাদি করে ফেলেও রেখেছিল। বলেছিল- “বোঝ্ কেমন কষ্টে থাকি আমরা।” না, সবাই অমানুষ হলে সভ্যতার চাকা থেমে যেত। গরমে শিশুদের কষ্ট হচ্ছে দেখে অবরুদ্ধদের সিলিংফ্যানসম্বলিত ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন জওয়ানদেরই কেউ-কেউ।
যেহেতু লাশের সন্ধান মেলেনি, স্বামীকে জীবিত ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা এখনও হয়তো জেগে আছে তাসনোভার মনে। তখন সব আশাই যাদের মুছে গেছে, মেজর আসাদের স্ত্রী সাইকি তাদেরই একজন। একদিন রোমান পুরাণ ঘেঁটে অভিভাবকদের কেউ তার নামটি রেখেছিলেন। যদিও ভাগ্য তার পুরাণের সাইকির মতো নয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল আসাদ-সাইকির ৬ষ্ঠ বিয়েবার্ষিকী। সুখের দিনটি পূর্বাপর আতঙ্ক আর কবরের নিস্তব্ধতায় অস্ত গেছে। কান্নাভেজা চোখে সেকথা বলার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছেন সাাইকি, যার সংবাদ ও সাক্ষ্য মূল্য আছে। কী সেই তথ্য? অবরুদ্ধকালে ডিএডি তৌহিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল সেলফোনে। পড়শি এই মানুষটিকে (নাকি ‘অমানুষটিকে’?) ‘ভাই’ ডেকেও কিংবা শিশুকন্যার দোহাই দিয়েও স্বামীকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। উল্টো প্রতারিত হয়েছেন। “আমার পিঠেও জওয়ানদের রাইফেলের নল, আমাকে আর ফোন করবেন না’ বলে সংযোগ কেটে দিয়েছিলেন তৌহিদ। অথচ এর পরপরই টিভির পর্দায় তাকে বিডিআর সদর দফতরের গেটে জঙ্গিদের নেতৃত্ব দিতে দেখেছেন সাইকি। ঐ সময় শিশুকন্যাটি তার মাকে প্রশ্ন করেছিল- “ওরা আমার বাবাকে কষ্ট দিচ্ছে?” নিষ্পাপ ঐ শিশুটিকে তৌহিদ কোলেও নিয়েছেন নিকট-অতীতে। সেকথা মনে করিয়ে দেওয়ার পরও তার পাষাণহৃদয় গলেনি।
সাইকির সন্দেহ যদি গোয়েন্দাতদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তৌহিদকে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত করলেও যথেষ্ট হবে না। তাসনোভা-সাইকির মতো অর্ধশতাধিক নারীকে যারা চরম অসহায়ত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে, মদদদাতাসহ ঐ সব পাষণ্ডের কঠিনতম সাজা হওয়া উচিত। আবার তাসনোভাসহ কারও-কারও বক্তব্যে মানবিক আচরণসমপন্ন জওয়ানদের কথাও তো উঠে এসেছে। অতএব হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির পাশাপাশি পরিস্থিতির শিকার নিরপরাধ জওয়ানদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। ভুললে চলবে না- তাদেরও সন্তান-পরিজন আছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাহসিকতাকেও খাটো করে দেখলে অন্যায় হবে। স্ত্রী-কন্যার পিছুডাক উপেক্ষা করে তিনিই তো প্রথম মৃত্যুউপত্যকায় পা বাড়িয়েছিলেন।
বিডিআর জওয়ানদের সুদীর্ঘ বঞ্চনাকে হত্যাকারীরা সুকৌশলে ব্যবহার করেছে- এ কথা কি অস্বীকার করার জো আছে? যদি তা-ই হয় ‘মানুষে-মানুষে সামাজিক ও অর্থনেতিক অসাম্য বিলোপ’কামী সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রতি শাসকদের দীর্ঘ উপেক্ষাও বিডিআর নাশকতার জন্য দায়ী। হ্যাঁ, এই ঘটনা থেকে পাঠ নিয়ে পুলিশের রেশনবৈষম্য দূর করার চটজলদি সরকারি সিদ্ধান্তটি ভালো। কিন্তু দিনবদলের সনদ হাতে সংসদে বসতে না বসতেই সাংসদদের শুল্কমুক্ত গাড়ির বিলটি কেন আনা হয়েছিল? জনগণের আগে জনপ্রতিনিধিদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- “পশ্চাতে রেখেছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।/ অজ্ঞানের অন্ধকারে/ আড়ালে ঢাকিছ যারে/ তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।” যতদিন না সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে বৈষম্য দূর হচ্ছে, ততদিন পশ্চাতে-থাকারা অগ্রবর্তীদের পশ্চাতে টানবেই। অপরাধ-সন্ত্রাস-নাশকতাও পুনঃপুনঃ সংঘটিত হবে।
শহীদ সেনাকর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ হয়েছেন। সরকার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সেনাপরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। খুবই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত এগুলো। প্রশ্ন এই যে- একই নাশকতায় নিহত বেসামরিক লোকজনের প্রতিও কি সমান সহমর্মিতা দেখাচ্ছে সরকার? ৪ মার্চের আমাদের সময়-এ প্রকাশিত খবরে প্রকাশ- রিকশাওয়ালা (মতান্তরে রাজমিস্ত্রি) আমজাদ, সব্জিবিক্রেতা হৃদয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তারেকের পরিবারের অভিযোগ- মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেত্রী দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কোনও স্থানীয় সাংসদ তাদের খোঁজ নেননি। স্বামীর শেষকৃত্যের জন্য পাঁচ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছে আমজাদের স্ত্রী রাশেদা বেগমকে। কেন? তাসনোভা ও সাইকির চেয়ে রাশেদার ক্ষতি ও বেদনা কম কীসে? মানুষে-মানুষে বিস্তর বৈষম্যের দেশে- জীবনে না হোক- মরণে হলেও- অন্তত একটিবার- ধনী-গরিব, অফিসার-জওয়ান, আর্মি-সিভিলিয়ন- সব বৈষম্য দূর হোক। দুর্যোগকবলিত এই বিষাদকালে দুই নেত্রীর কটুকাটব্যময় বাকযুদ্ধ কারো কাম্য নয়। বন্ধ হোক সেটাও।
