রাজাকারকে ‘না’

বিজয়ের মাসে নির্বাচন : রাজাকারকে ‘না’

‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’

এ রকম স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল ১৯৭১। একযোগে একত্রিত হয়ে সব মুক্তিকামী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিসংগ্রামে। পাক হানাদারদের নির্বিচার গণহত্যার সামনে তৈরি হয়েছিল এক দুর্বার প্রতিরোধ। প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই প্রতিশোধের আগুনে জ্বালিয়ে মেরেছে হায়েনার দলকে। মুক্ত করেছে স্বদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে এক নতুন দেশ। বাংলাদেশ। কিন্তু দেশটির জন্মের সময়ই কিছুসংখ্যক দালাল হাত মেলায় পাকিস্তানের সঙ্গে। গড়ে তোলে আল বদর ও আল শামসের মতো নৃশংস বাহিনী। এসব বাহিনীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘রাজাকার’ নাম দিয়ে সরকারের বাহিনীর স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই রাজাকাররা পাক হানাদারদের সঙ্গে মিলে এদেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপরে চালায় ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে দেশবিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত হয়। ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের। স্বাধীনতার পর এদের বিচার করার প্রক্রিয়া শুরু করে বঙ্গবন্ধু সরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জিয়াউর রহমান সরকার কর্তৃক দালাল আইন রহিত হবার ফলে থেমে যায় বিচার। যুদ্ধাপরাধীরা পালাক্রমে জায়গা করে নেয় রাজনীতিতে। একসময় ক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত হয়। তবে তাদের বিচারের দাবি থেমে যায়নি, বরং দিন দিন আরও জোরালো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। আর সেই প্রতিরোধ শুরু হচ্ছে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে। এবারের নির্বাচনে মোট ১৬ জন যুদ্ধাপরাধী অংশ নিচ্ছে। যেখানে যুদ্ধাপরাধী, সেখানেই প্রতিরোধ-এ রকম আহ্বান নিয়ে রাজাকার প্রতিরোধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম। সঙ্গে আছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব সংগঠন। আর তাদের এ আহ্বানে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। আবার সবাই একত্রিত হতে হবে ৭১-এর মতো। ভোটের মাধ্যমেই রাজাকারদের প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘না’ জানানোর সুযোগ এসেছে। তাই সবার উচিত এই সুযোগ কাজে লাগানো। আর এ কারণে জেনে নিতে হবে ইতিহাস। চিনে নিতে হবে ঘাতক দালাল রাজাকারদের । জনগণের সামনে রাজাকারদের চেহারা তুলে ধরার জন্যই সাপ্তাহিক-এর এই প্রয়াস। এজন্য কাজ করেছে সাপ্তাহিক-এর একটি দল। সাপ্তাহিক-এর এই অনুসন্ধান দলে কাজ করেছেন মহিউদ্দিন নিলয়, এসএম আজাদ, সিফাত রেজা, সৌরভ রহমান, মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান, সাজেদ রহমান, সৈয়দ রুমী, দেবাশীষ দেবু, শরিফুল ইসলাম পলাশ। বিভিন্ন বই, পত্রিকা, ইন্টারনেট ও নানা দলিলাদি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তথ্য। এ সময় কথা হয়েছে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত মানুষের সঙ্গে। তারপর অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করার জন্য চ্যানেল আই, প্রথম আলো ও সুজন-এর স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তারাও বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছেন। এদের সবার প্রতি সাপ্তাহিক প্রকাশ করছে কৃতজ্ঞতা। এসব তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি গ্রন্থনা করেছেন মহিউদ্দিন নিলয়, সিফাত রেজা ও মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান

‘যে সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এখনো সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি তাদের পুনর্বাসন করা হবে’

এটি একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশবিশেষ। এই দলটি তাদের ইশতেহারে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার’ শিরোনামে একটি অংশ সংযোজন করেছে। এই অংশটিতে ৬ দফা অঙ্গীকারনামার প্রথম দফায় ওপরের অংশটি উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই অঙ্গীকার করেছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল। যে দলটি মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারী এবং পাকিস্তানের সহযোগী। দলটির নাম জামায়াতে ইসলামী। তারা এখন ভোটের রাজনীতিতে এসে মুক্তিযুদ্ধের অধিকার নিয়ে কথা বলছে!

‘দেশে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কখনো ছিল না, এখনো নেই। অতীতকে বিকৃত করে পেশ করা ঠিক নয়। ৭১ সালকে কেন্দ্র করে তারা যা বলছে তা কল্পনাপ্রসূত, উদ্ভট, বানোয়াট, অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। ’

২৬-১০-২০০৭, দৈনিক সমকাল

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপ শেষে জামায়াতের সেক্রেটারি মুজাহিদ এই উক্তিটি করেছিল ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর। এরপর গোটা দেশে শুরু হয় তোলপাড়। সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক দল, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তি এর প্রতিবাদ জানায়। দেশজুড়ে শুরু হয় আন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলনে টনক নড়েনি সরকারের। রাষ্ট্রের হয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতেই দেখা যায়নি বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিদের। এতে করে আরও সুযোগ পেয়ে যায় জামায়াত। আর এর ধারাবাহিকতায় জামায়াতপন্থী সাবেক আমলা শাহ আবদুল হান্নান তো মুক্তিযুদ্ধকে অভিহিত করেন ‘গৃহযুদ্ধ’ হিসেবে। শুধু তাই নয়- এই সাবেক আমলা বলেছিল, সুন্দরী নারী ও হিন্দুদের সম্পত্তির লোভে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে! সেই জামায়াত তাদের ইশতেহারে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বোধন করছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা! তাদের কাছে এখন প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধই যদি না হয়ে থাকে তাহলে বীর মুক্তিযোদ্ধা এলো কোথা থেকে? এই হচ্ছে জামায়াতের রাজনীতি। ক্ষমতায় যাবার জন্য এখন মুক্তিযুদ্ধকেও ব্যবহার করতে চাইছে তারা। ক্ষমতায় যাবার এ এক নতুন কৌশল!

নির্বাচনকে সামনে রেখে সব দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এ ইশতেহারে অনেক ভালো স্বপ্ন যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি আছে স্ববিরোধিতাও। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াত অঙ্গীকার করেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে! অথচ কিছুদিন আগেও তারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেছে। বলেছে, এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। জাতির সামনে তাদের সেই প্রকাশ্য দম্ভোক্তি কী সাধারণ মানুষ এত সহজেই ভুলে যাবে! জামায়াতের এই রাজনৈতিক কূটকৌশল কী ভোটে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে? কোনোভাবেই তাদের এই দুরভিসন্ধি সফল হওয়ার নয়। অন্তত মুক্তিকামী মানুষের কাছে তো নয়ই। এ দেশের প্রতিটি মানুষ তাদের ভালো করেই চেনে।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি

শুধু তাই নয়, নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ব্লাসফেমি’ আইন করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। এ সম্পর্কে সাংবাদিকরা নিজামীকে প্রশ্ন করলে তিনি ইংল্যান্ডে ব্লাসফেমি আইনের কথা বলেন। এটা তার নিছক মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। ইংল্যান্ডে ২০০৮ সালের ৮ মে অকার্যকর ব্লাসফেমি আইনটি বাতিল করা হয়। এ বছরের ৮ জুলাই থেকে সেই বাতিলের আদেশটি কার্যকর হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইংল্যান্ডে এই আইন সর্বশেষ প্রয়োগ করা হয়েছিল ১৯২১ সালে। ধর্মকে পুঁজি করে জামায়াতিদের এ ধরনের রাজনীতিও নতুন কিছু নয়। তাদের এই অঙ্গীকার আমাদের মুক্তি সনদেরও পুরোপুরি পরিপন্থী। অসামপ্রদায়িক চেতনা থেকেই বাংলাদেশের জন্ম এবং আমাদের পবিত্র সংবিধানেও এর উল্লেখ আছে। তাই রাষ্ট্রের মূল চেতনার ওপরেই বরং এক ধরনের আঘাত হানা হয়েছে এ রকম অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।

জামায়াত সবসময়ই ধর্মকে তাদের রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে। অথচ নিজেদের ব্যক্তিগত জায়গায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সেখানে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে তারা সবসময়ই উচ্চবাচ্য করে এসেছে। কিন্তু জামায়াত নেতারা তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করেছে ইংরেজি শিক্ষায়।

সৎ লোকের শাসন চাই!

জামায়াতের রাজনৈতিক স্লোগান। এই স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব ধরনের শাস্তি নিশ্চিত করা ও দুদককে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেছে ইশতেহারে। কিন্তু অতীত তাদের এই অঙ্গীকারনামারও বিপরীত সাক্ষ্য দেয়। গত জোট সরকারের আমলে চলা সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি, বরং তারাও বীরদর্পে তাদের মাত্র ১৭ জন সাংসদ নিয়েই নিমজ্জিত হয়েছে দুর্নীতিতে। এ সরকারের সময়ে তাই দুদকের তালিকায় এসেছে জামায়াতের সাংসদরাও। চট্টগ্রামের সাবেক জামায়াত সাংসদ শাজাহান চৌধুরী তো ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ হারিয়েছে। কেউ কেউ জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেছে। পরে জামিনে বেরিয়েছে। প্রভাবশালী নেতা মাওলানা সোবহানের বিরুদ্ধে ত্রাণের টিন চুরির অভিযোগ উঠেছে। এ রকম চুরি ও আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির অভিযোগ আছে আরও অনেকের বিরুদ্ধে। শতকরা হিসেব করলে আনুপাতিক হারে তা বড় দুই দলকেই ছাড়িয়ে যাবে।

ঘাতক দালাল রাজাকার

আল বদর একটি নাম! আলবদর একটি বিস্ময়! আল বদর একটি প্রতিভা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আল বদর সেখানেই। যেখানেই দুষ্কৃতকারী, আল বদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতকারীদের কাছে আল বদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’

১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের অংশবিশেষ। এ অংশটুকুই প্রমাণ করে আল বদরের অস্তিত্ব এবং এর সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা। এ ‘সাক্ষাৎ আজরাইল’রা পাক হানাদারদের দোসর হয়ে চালায় ধ্বংসযজ্ঞ, নির্বিচারে গণহত্যা। লুটপাট, ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এরা চিহ্নিত হয় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। এ সব রাজাকার আল বদরের বিচারের দাবি ওঠে শহীদ পরিবারসহ এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষ থেকে। সরকারিভাবে তৈরি করা হয় তালিকা। ৩৭ হাজারের বেশি যুদ্ধাপরাধী তালিকাভুক্ত হয়, যা থেকে ২৬ হাজারের মতো যুদ্ধাপরাধীকে বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। কিন্তু যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দালাল আইন তৈরি করে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সরকার দালাল আইন বাতিল করলে থেমে যায় বিচার প্রক্রিয়া। ’৭১-এর আজরাইলখ্যাত যুদ্ধাপরাধীরা ঘুরে বেড়ায় এই স্বাধীন দেশে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ডাল-পালা ছড়াতে থাকে। ধর্মকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে দলে ভেড়াতে থাকে তারা। এরা রাজনৈতিক জোট গড়ে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়েছে এরই মধ্যে। মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে উড়িয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী এতগুলো বছরে থেমে থাকেনি তাদের নিধনযজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে তারা হত্যা করেছে এ দেশের বহু প্রগতিশীল মানুষকে। যুদ্ধাপরাধের বিচার না হওয়ায় তারা তাদের অপরাধকর্ম চালিয়ে গেছে নিশ্চিন্তে। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র দিনে দিনে শুধু পিছু হটেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে। ৩৬ বছর পর এসে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে। সেনাপ্রধানের এক ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বিচারের দাবিটি পায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া আর শুরু হয় না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিচারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। কিন্তু বিচারের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকারের হাতে। সেই সরকার আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে। এই নির্বাচনই সুযোগ তৈরি করেছে এ দেশের মুক্তিকামী প্রতিটি মানুষের সামনে। তারা তাদের ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করে শিক্ষা দিতে পারে এসব যুদ্ধাপরাধীকে।

কিন্তু কারা এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী? এ নিয়ে কেউ কেউ কথা তুললেও খুব বেশি প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই এ ক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকাশিত দৈনিক সংগ্রামের পাতায় পাতায় বিস্তর প্রমাণ রয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। এছাড়া জেনারেল নিয়াজীর লেখা বইয়ে ৫০ হাজার রাজাকার বাহিনীর কথা উল্লেখ আছে। আল বদর, আল শামস নিয়ে গঠিত রাজাকার বাহিনীর কথা পাকিস্তান সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছিল। ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট ÔThe East Pakistan Razakars Ordinance’ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক গেজেট নোটিফিকেশনের (No.4852/583/Ps-1y/3659D-2A) মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীকে সরাসরি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অধীনে আনা হয়। এ অধ্যাদেশে রাজাকার বাহিনীকে Auxiliary Forces হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য অনেক দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ১৯৯২ সাল থেকে এ কমিটি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে। এ কমিটি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে গণআদালতে মামলা তোলে। এরপর ১৯৯৪ সালে গণতদন্ত কমিশন গঠন করে একটি রিপোর্ট দেয় দীর্ঘ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে। এখানে ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম উঠে আসে। এরপর ’৯৫ সালে তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় রিপোর্টে আরও ৮ জনের নাম তালিকায় আনা হয়। এর বাইরে বিভিন্ন বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকায় এ নামগুলো উঠে এসেছে বারবার।

নির্বাচনকে সামনে রেখে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম প্রাথমিকভাবে ৫০ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা প্রকাশ করেছে। ফোরামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দাবি জানানো হয় তারা যেন যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে মনোনয়ন না দেয় এবং ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় তারা যেন এদের ভোট না দেন। দুটি রাজনৈতিক দল ফোরামের এই দাবি আমলে নেয়নি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের মনোনয়ন দিয়েছে। এই দুটি দল হলো চারদলীয় জোটের দুই প্রধান শরিক বিএনপি ও জামায়াত। এর বাইরে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি প্রথমে দুজন যুদ্ধাপরাধীকে মনোনয়ন দিলেও আওয়ামী লীগের আপত্তির মুখে তা নাকচ হয়ে যায়। তাই চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি জামায়াতের বাইরে আর কোনো দলে যুদ্ধাপরাধী মনোনয়ন পায়নি। এই দলের মধ্যে বিএনপি থেকে ২ এবং জামায়াত থেকে ১৪ জন যুদ্ধাপরাধী মনোনয়ন পেয়েছে। এই ১৬ জনের মধ্যে ৬ জনের নাম আছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম ঘোষিত ৫০ জনের তালিকায়। ১৯৯৪-৯৫ সালে গঠিত গণতদন্ত কমিশনের তালিকায় উঠে আসা ১৬ জনের নামের তালিকায়ও আছে এসব যুদ্ধাপরাধীর নাম। তখনকার চিহ্নিত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে এবার নির্বাচন করছে ৬ যুদ্ধাপরাধী। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মাওলানা আবদুস সোবহান ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এই ৬ জনের নাম আছে দুটি তালিকায়ই।

নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে একটি ধারা সংযোজন করেছে। কিন্তু তাতে আদতে কোনো লাভ হয়নি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের শনাক্ত করার কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেনি সরকার। তারা দায় এড়িয়ে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা। অংশ নিচ্ছে এবারের নির্বাচনে।

আমার ভোট আমি দেব

দেখে শুনে জেনে দেব

এই স্লোগান নিয়েই এবারের নির্বাচন। তাই অন্য কোনো রাজনৈতিক স্লোগানে না ভুলে ভোটারদের যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। দেশ গড়ায় ভূমিকা রাখতে হবে অত্যন্ত সাবধানতায়। দেশের বিরোধিতাকারী ঘাতক দালাল রাজাকাররা যেন কিছুতেই আবার ক্ষমতায় বসার সুযোগ না পায়। তারা যেন আমাদের পবিত্র সংসদকে কলুষিত করার সুযোগ না পায়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবেলা করতে হবে। তাই ভোটের আগে তাদের চিনে নেয়া উচিত। জেনে নেয়া উচিত ইতিহাসের সেই অধ্যায়টি। একবার যে রাজাকার, চিরকাল সে রাজাকার এই বাণী আমাদের সামনে যেন উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আর তাই স্বাধীনতার ৩৭ বছর পরে এসেও তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাট আর দলীয়করণের মাধ্যমে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এদেরকে সবারই জানতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে এদের প্রতিটি বিষয়ে।

মতিউর রহমান নিজামী

(মইত্যা রাজাকার)

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির। গত জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী। জামায়াতের এই প্রতাপশালী নেতা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়েই অবতীর্ণ হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী সংগঠন হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিল সে। এই সংগঠনটি বর্তমানে নাম বদলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সক্রিয় গোষ্ঠী আল বদর বাহিনীর প্রধান ছিল ঘাতক নিজামী। স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরোটা সময় অবতীর্ণ ছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকায়। পাকিস্তান দিবসে এক সভায় সে বলে, ‘ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রতিটি কর্মী দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি তারা পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতেও পারে।’ ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় আয়োজিত ছাত্রসংঘের এক চা-চক্রে সে আবার বক্তব্য দেয়, ‘সশস্ত্র ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও তাদের এ দেশীয় দালালরা যে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা চালাচ্ছে, একমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক যুবকরাই তাদেরকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম।’ ১২ এপ্রিল শান্তি কমিটির ব্যানারে পরিচালিত সভায় যোগ দিয়েছিল নিজামী। ১৩ তারিখের দৈনিক সংগ্রামে তা প্রকাশিত হয়। পাবনায় নিজামীর নির্বাচনী এলাকা বেড়া ও সাঁথিয়া থানার অনেক মুক্তিযোদ্ধা নিজামীর দুষ্কর্মের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে আছেন এখনো।

পাবনার সাঁথিয়া থানার বোয়াইলমারী গ্রামের মৃত লুৎফর রহমান খানের ছেলে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। আল বদর বাহিনীর প্রধান হওয়ার ফলে তার নিজ জেলার ওপর সে ভয়ঙ্কর প্রভাব বিস্তার করে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি রাজাকার এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানদের চরম আস্ফালন ঘটে। পাক বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর লোমহর্ষক অত্যাচার, নির্যাতন চালায়। নির্বিচারে হত্যা করে নিরীহ ও মুক্তিকামী মানুষদের। লুটে নেয় তাদের অর্থসম্পদ এবং মা-বোনের ইজ্জত। শুধু নিজামীর কারণেই এবং তার একাত্তরের ভূমিকার জন্যই তাকে এলাকাবাসী একাত্তরের ‘মইত্যা রাজাকার’ বলে চেনে ও জানে। আল বদর রাজাকারদের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঁথিয়া-বেড়া এলাকায় প্রায় ১২শ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনী। তার মধ্যে সাঁথিয়ার ডেমরার বাউশগাড়ী গ্রামে ৩ শতাধিক, ধুলাউড়িতে ৩৫, শহীদনগর ডাববাগানে ৩৬ এবং করমজার সোনাকান্দা গ্রামে বেশ কজনকে হত্যা করেছিল। এখনো ডেমরার বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ গড়ে ওঠেনি। এ বধ্যভূমি সারা দেশে আলোচিত। সেখানকার মৃত্যুঞ্জয়ীরা আজও হতাশ। তিন যুগ ধরে অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে লালন করে জীবন প্রবাহ টিকিয়ে রেখেছেন তারা। তাদের স্মরণে কর্মসূচি পালন করার মতো মানুষ থেকেও নেই। বধ্যভূমিকে কেন্দ্র করে কোনোরূপ অনুষ্ঠান পালনের উদ্যোগও নেয়া হয় না। এমন কি তৈরি করা হয়নি নিহতদের তালিকাও। তাই অবসাদে ভেঙে পড়ছেন মৃত্যুঞ্জয়ীরা। শীতল হয়ে আসছে যেন বধ্যভূমির তাপ। বধ্যভূমির উষ্ণ রক্তস্রোত থেকে উঠে আসা কয়েকজন মৃত্যুঞ্জয়ীর লোমহর্ষক গণহত্যার গল্প শুনে বাউশগাড়ী ও রূপসী এলাকার শিশু-কিশোরেরা এখনো আঁতকে ওঠে। গা শিউরে ওঠা কাহিনী মুখে মুখে ফেরে। এ জেলার মধ্যে যে সব এলাকায় আল বদর বাহিনীপ্রধান নিজামীর ইন্ধনে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল তার অধিকাংশ স্থানেই কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যাচ্ছে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার খণ্ড খণ্ড আঞ্চলিক ইতিহাস।

নির্বাচনের মনোনয়ন ফরমে হলফনামায় নিজামী উল্লেখ করেছে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তিনটি মামলার অভিযোগ রয়েছে। একটি মামলার কার্যক্রম ২০/০৫/০৭ তারিখে স্থগিত হয়েছে। অপর একটি মামলার কার্যক্রম ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২ ও ৫ ধারা এবং জরুরি বিধিমালা আইনের-০৭ নং এর ১৫ বিধি মোতাবেক স্থগিত রয়েছে। এছাড়া অন্য মামলাটির কার্যক্রমও ২ মাসের জন্য স্থগিত আছে, যা মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি মিস কেস নং- ১৯৩২৭/০৮। এ সরকারের আমলেই নিজামী দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছে।

গত সরকারের সময়ে পাবনায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রত্যক্ষ মদদে অবাধ দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে। হয়েছে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, সরকারি কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল, এমনকি শত শত প্রকল্পের কাজের নামে সরকারি অর্থের লুটপাট, মন্দিরের জায়গা মাদ্রাসার কাছে বিক্রিসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জামায়াতিকরণ করা হয়েছে শতাধিক প্রতিষ্ঠান। সেই নিজামী আবার ভোটারদের দুয়ারে।

মাওলানা আব্দুস সোবহান

পাবনা-৫ (সদর) আসনের সাবেক সাংসদ। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এই নেতা এবারও প্রার্থী হয়েছে সদর আসনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল এই মাওলানা সোবহান। গণতদন্ত কমিশন ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ঘোষিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় নাম আছে তার। এলাকায় তার লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের জীবন্ত সাক্ষী এখনো রয়েছে।

১৯৭১-এর ১৪ মে। ফরিদপুর উপজেলার ডেমরার বাউশগাড়ী খালে চলে এক নির্মম গণহত্যা। রাতে গ্রাম থেকে ধরে আনা হয় প্রায় ৩শ নারী-পুরুষকে। সূর্যোদয়ের পর পরই গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের। মৃত্যুঞ্জয়ী খলিলুর রহমান (৬৬), মজিবর খাঁ (৬৭), মোকছেদ আলী (৫৬), আব্দুল গফুর (৫৮) প্রমুখ বধ্যভূমির কাহিনী শোনান। এই কাহিনী থেকে জানা যায়, আল বদর বাহিনীর প্রধান নিজামীর ইশারায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুস সোবহান এ এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যা ঘটিয়েছে। তারা জানান, পাবনা শহরের ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ডেমরার একটি ইউনিয়ন। এলাকাটি নিরাপদ ভেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় আশপাশ থেকে অনেক হিন্দু-মুসলমান এখানে আশ্রয় নেন। সে সময় এখানে সড়ক যোগাযোগ ছিল না। নদীপথই ছিল একমাত্র যোগাযোগের উপায়। পার্শ্ববর্র্তী বেড়া উপজেলার পাকবাহিনীর দোসর আসাদ ১৩ মে রাতে বাঘাবাড়ী ঘাট থেকে একদল হানাদার বাহিনীকে নদীপথে এই গ্রামে ডেকে আনে। কথিত রয়েছে হানাদার বাহিনীকে আসাদ জানায়, মুক্তিবাহিনী বাঙালি এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তখন গ্রীষ্মকাল। রাতভর ঘরে ঘরে তল্লাশি আর নির্যাতন চালিয়ে হায়েনারা ডেকে তুলে আনে অসংখ্য মানুষ। এদের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও ছিলেন। তারা বেশ কিছু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। গুলি ছুুুুঁড়ে আতঙ্ক সঞ্চার করে। ঘুমন্ত মানুষ গুলির শব্দে জেগে ওঠে। সন্ত্রস্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। হানাদাররা তাদের ধরে এনে ভোররাতে বাউশগাড়ীর শুকনো নয়নজলিতে সারিবদ্ধভাবে বসায়। আলো-আঁধারিতে পরিবেশ এমনিতে ছিল বিষাদমগ্ন। বাতাসে ঘর পোড়া ঘ্রাণ আর আর্তচিৎকার ভাসছিল। শ শ মানুষ ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে অপেক্ষমাণ। বিনা প্রতিরোধে সকলেই আল্লাহকে ডাকছেন। এমন সময় পূর্ব আকাশে সূর্য উঠতে না উঠতেই বেজে ওঠে মিলিটারির পিলে চমকানো কমান্ডো আওয়াজ। শুরু হয় ফায়ার। গুলিবিদ্ধদের আর্তচিৎকারে ডেমরার আকাশ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই গণহত্যা চালানোর পরই তারা এলাকা ত্যাগ করে। নিহতদের মধ্য থেকে ২ জন মহিলাসহ ১৫ জন মৃত্যুঞ্জয়ী হন। তারা শুকনো খালের রক্তস্রোত সাঁতরিয়ে ঘরে ফেরেন। এখনো উচ্চস্বরে কথা শুনলে তাদের হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে। রক্ত দেখলে বধ্যভূমির কথা মনে পড়ে। গণহত্যা আর নৃশংস নিপীড়নের কথায় সকল বোধ আজ আচ্ছন্ন প্রায়। বর্তমানে এই বধ্যভূমি ভরাট করে বাঁশ বাগান তৈরি করা হয়েছে। গণকবরের অবিস্মরণীয় স্মৃতিময় স্থান ম্লান প্রায়। গণহত্যা শুধু ঐ সব এলাকায় চলেনি। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুস সোবহান ও তার দোসরদের নেতৃত্বে ১৯৭১-এর ১ ডিসেম্বর আর একটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল পাবনার নাজিরপুর এলাকায়। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী রাজাকার আল বদর সঙ্গে নিয়ে গ্রামটির চতুরদিক ঘিরে ফেলে বর্বর হামলা চালায়। ভোর থেকে শুরু করে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও লুটতরাজ। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে বন্দি করে শতাধিক ব্যক্তিকে। বন্দিদের হাত ও চোখ বেঁধে নিয়ে যায় পাবনা-পাকশী সড়কের উত্তর পাশের একটি খালের ধারে। সেখানে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাবনার এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাসে অনেক গণহত্যা চালিয়েছে পাকবাহিনী তাদের দোসরদের সহায়তায়। সেখানেও আছে গণকবর। কালের বিবর্তনে সে কবরগুলো কোথায় তা আজ অজানা। কিন্তু ঘাতক সোবহানরা আজো বেঁচে আছে, ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীন বাংলায়।

মাওলানা সোবহানের মনোনয়ন ফরমের হলফনামায় দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয় ১টি। যার ফাইনাল রিপোর্টে সে অব্যাহতি পেয়েছে। এ সরকারের সময়ে ত্রাণের টিন চুরির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।

বিগত নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সোবহান তার নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অনেক কিছুই কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। তার ভঙ্গকৃত প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ইছামতি নদী পুনর্খনন ও প্রশস্ততা, মা ও শিশু কেন্দ্র হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধিকরণ, পাবনা শহরে একটি সুপরিসর কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়াতে যমুনা নদীর ওপর ওয়াইটাইপ সেতু নির্মাণ, আটঘরিয়া কৃষি কলেজ স্থাপন, পাবনা মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন, এডওয়ার্ড কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পাবনা শহরে এক হাজার লোক বসতে পারে এমন একটি অডিটরিয়াম তৈরি, রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ইত্যাদি। কার্যত নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।

আলী আহসান মোঃ মুজাহিদ

’৯১ ও ’৯৬ সালে ফরিদপুর থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শোচনীয় হারের পর আর নির্বাচন করেনি। রাজনৈতিক জোট করে গত সরকারের মন্ত্রী হয়েছে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফকে বাদ দিয়ে ফরিদপুর-৩ আসনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পেয়েছে এবার। নির্বাচনী প্রচারও শুরু করে দিয়েছে এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী।

এই ঘাতক বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। গত জোট সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সে ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা মহানগর সভাপতি এবং ঢাকার আল বদর বাহিনীর কমান্ডার। ফকিরাপুলে ফিরোজ মিয়া ওরফে ফেরু মেম্বারের সাহায্যে সে ৩০০ সদস্যের এক সশস্ত্র স্কোয়াড গড়ে। এই স্কোয়াড মতিঝিল, ফকিরাপুল, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টনসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন পরিচালনা করে। ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের এক সমাবেশে সে বলে, ‘ঘৃণ্য শত্রু ভারতকে দখল করার প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের আসাম দখল করতে হবে। এ জন্য আপনারা সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।’ ৪ ডিসেম্বর ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণকে অভিনন্দন জানিয়ে সে বক্তব্য দেয়, ‘এ দেশের ছাত্র জনতা ’৬৫ সালের মতো এবারও ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করে যাবে।’

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির দায়ে মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। বেশ কিছুদিন গ্রেপ্তার এড়ানোর পর অবশেষে আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মন্ত্রী থাকাকালীন তার বিরুদ্ধেও রয়েছে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ।

সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ও

গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী

সর্বশেষ দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল বহুদিন। অবশেষে জামিনে বেরিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে ফিরেছে এলাকায়। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুই আসনে। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৬। আর তার ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী নির্বাচন করছে চট্টগ্রাম-৫ আসনে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে যারা যুক্ত অথবা ইতিহাস যারা জানেন, চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহিরা গ্রামের চৌধুরী পরিবারের কাহিনী তাদের অজানা নয়। এ পরিবারের এক দারোগার পুত্র ফজলুল কাদের চৌধুরী ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসে। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই এ চৌধুরী কুখ্যাতি অর্জন করে। পাকিস্তানের ঊষালগ্নে ১৯৪৮ সালে তার গুদাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ের ১১৫ মণ তামার তার উদ্ধার হলে বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল’ এ্যামেন্ডমেন্ট এ্যাক্টে তাকে ১০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ২ সপ্তাহের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ফজলুল কাদের চৌধুরী রাজনৈতিক পরিচয় দেখিয়ে হাইকোর্টের মাধ্যমে দণ্ড মওকুফ করানোর চেষ্টা করলে বিচারপতি তার আবেদন মঞ্জুর না করে বরং তার সাজা আরও বাড়িয়ে অর্থদণ্ডের পরিবর্তে ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।

সূত্র : ২ ডিএল আর ১৯৫০ ফজলুল কাদের চৌধুরী বনাম ক্রাউন

এই ফজলুল কাদের চৌধুরী ষাটের দশকে সামরিক শাসনের সময় প্রথমে আইয়ুব মন্ত্রিসভার সদস্য এবং পরে ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলিত স্পিকার হয়। এ সময়ই রংপুর সদরে তার নির্দেশে ছাত্র আন্দোলনের ওপর নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়। চট্টগ্রামে বিরোধীদের বিরুদ্ধে লালদীঘির ময়দানে তার গুণ্ডাবাহিনীকে সে আহ্বান করে ‘শুককুয্যা কডে’ চিৎকারে। তার এ হুঙ্কার ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতির একটি আলোচিত ঘটনা।

সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এই ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ২২। চৌধুরীর বাসভবন ‘গুডস হিল’ মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল ‘কসাইখানা’। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। এখানে কয়েকটি রিপোর্ট উল্লেখযোগ্য!

‘সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ‘গুডসাহেবের হিলস্থ’ বাসায় মরহুম ড. সানাউল্লাহ এক ছেলেসহ চাটগাঁ-এর কয়েকশ ছেলেকে ধরে এনে নির্মম অত্যাচার করত। ১৭ জুলাই ১৯৭১-এ ছাত্রনেতা ফারুককে ধরে এনে পাক বাহিনীর সহায়তায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হত্যা করে। ২৬ মার্চ থেকে আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত সালাউদ্দিন চৌধুরীদের বাসায় পাকবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য মোতায়েন থাকত। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ তাদের পরিবার প্রায় দেড় মণ সোনাসহ পালানোর সময় মুক্তিবাহিনীর কাছে ১৮ ডিসেম্বর ’৭১-এ ধরা পড়ে।’

সূত্র : দৈনিক বাংলা ৮ জানুয়ারি ১৯৭২

‘গুডস হিল স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষের নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হয়। শোনা যায়, এ কেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে তার পুত্র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। শহরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষকে ধরে এনে এখানে ঝুলিয়ে পেটানো হতো। উল্লেখ্য যে, এ বাড়িতে প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুককে হত্যা করা হয়েছে। আল বদর বাহিনীর একটি বিশেষ গ্রুপ এ বাড়ির নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিল।’

সূত্র : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহর চট্টগ্রামের নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি : সাখাওয়াত হোসেন মজনু

‘নিজামুদ্দীন ১৮ নবেম্বর চট্টগ্রাম জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। সে বলে আমি ধরা পড়ি ৫ জুলাই। আমাকে ফজলুল কাদেরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফজলুল কাদেরের পুত্র সালাহউদ্দিন, অনুচর খোকা, খলিল ও ইউসুফ রড, লাঠি, বেত প্রভৃতি হাতে আমাকে পিটাতে থাকে। পাঁচ ঘণ্টা মারের চোটে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। ৬ জুলাই রাত সাড়ে ১১টায় আমাকে স্টেডিয়ামে চালান দেয়া হয়।’

সূত্র : বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত : মাহবুব-উল-আলম

‘চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, শ্রী কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয় এবং কুন্ডেশ্বরী বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর বাবু নূতন চন্দ্র সিংহের হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিল সালাহউদ্দিন কাদের বলে কথিত আছে। ২৯ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রায় ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন কুন্ডেশ্বরী ভবনে। এদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, ড. এ আর মল্লিক, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ। পাকবাহিনী চট্টগ্রাম দখলের পর এরা সবাই ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। বাবু নূতন সিংহকেও যাওয়ার কথা বলেছিলেন সবাই। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি মরতেই হয় দেশের মাটিতেই মরবো।’ পরিবারের সবাইকে সরিয়ে দিয়ে নিজে কুন্ডেশ্বরী মন্দিরে অবস্থান করছিলেন। পাকসেনা আসতে পারে অনুমান করে উঠানে চেয়ার-টেবিলও সাজিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চারটি ট্যাঙ্কসহ দুটি জিপে করে পাকবাহিনী কুন্ডেশ্বরী ভবনে আসে। এর একটিতে বসেছিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র পাক সেনাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজের কাজকর্ম ব্যাখ্যা করেন। সন্তুষ্ট হয়ে পাকসেনারা জিপে চলে আসে, কিন্তু সালাহউদ্দিন কাদের তাদের জানায় যে, তার বাবার আদেশ আছে ‘মালাউন নূতন চন্দ্র ও তার ছেলেদের মেরে ফেলার জন্য’। এরপর পাকবাহিনীর মেজর তাকে তিনটি গুলি করে। একটি গুলি তার চোখের নিচে বিদ্ধ হয়, একটা গুলি তার হাতে লাগে এবং তৃতীয় গুলিটি তার বুক ভেদ করে চলে যায়। তিনি চিৎকারে তার মায়ের নাম নিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যান।’

সূত্র : একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় : মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র

১৯৭২ সালে নূতন চন্দ্র সিংহ হত্যা মামলা হয়েছিল। নূতন চন্দ্রের ছেলে সত্যরঞ্জন সিংহসহ মোট ১২ জন সাক্ষী ছিলেন মামলায়। মামলার এফআইআর নং ইউ/এস/৩০২/১২০ (১৩)/২৯৮ বিপিসি/৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি বিচার শুরু হয়। আসামিদের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ পলাতক ছিল ৫ জন। বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ ৫ জন ছিল কারাগারে।

চট্টগ্রামের একজন শহীদের সন্তান শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর গণতদন্ত কমিশনকে জানান, তার বাবা শহীদ শেখ মুজাফফর আহমদ ও ভাই শহীদ শেখ আলমগীরকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল হাটহাজারী ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং পরে তাদের মেরে ফেলা হয়। স্বাধীনতার পর শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গংয়ের বিরুদ্ধে।

সূত্র : একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় রিপোর্ট

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে এই চৌধুরী পরিবার ৭ লাখ টাকা ও দেড় মণ সোনাসহ একটি ট্রলারে করে দেশ থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। সীমান্ত দিয়ে বর্মা পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করলে ‘জাঙ্গিয়া’ পরা অবস্থায় তাকে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেপ্তার করেন। পরে জেলখানায় তার মৃত্যু হয়।

চৌধুরীর পুত্ররা তখন কারাগারে বাবার মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। গ্রামের মানুষের কাছে তারা কৌশলে রটিয়ে দেয় যে কারাগারে রক্ষীবাহিনী তাকে হত্যা করে। দাফনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফজলুল কাদের চৌধুরীর কবর কয়েক দিন পাহারা দিয়ে রাখলে গ্রামের মানুষের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়।

আমাদের নষ্ট রাজনীতির সুযোগ নিয়েই সাকাচৌ’রা বারবার পুনর্বাসিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর এবং শেখ কামালের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বাবার ব্যবসা বাগিয়ে নেয়। ৯ জুলাই ’৯৮ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দ্রষ্টব্য : ‘এখন তিনি টাকার গরম দেখান, ’৭১ সালে সাহায্যের কথা বলেন, এই টাকা কোথা থেকে এসেছে? সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুট করে, সামরিক জান্তার পা চেটে এই টাকা এসেছে। তার বাবা বেঁচে থাকলে তার পেটে হাত দিলে ৩২ নম্বরের ভাত পাওয়া যেত। ’৭১ সালের পর জীবন ভিক্ষার জন্য বাপ-বেটাদের চোখের পানিতে ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি ভিজেছে। তাদের মুখে বড় কথা শোভা পায় না।’

সাকা চৌধুরী কেবল একাত্তরের ঘাতকই নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও পাকা খেলোয়াড়। জিয়ার সময় দেশে ফিরে এসে সবুর খানের মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। কিন্তু সাকা চৌধুরী বুঝেছিল আলোচনায় আসতে হলে বিরোধিতার ভূমিকায় আসতে হবে। সে কারণে সে জাতীয় সংসদে সে সময়ের তরুণ ত্রয়ী রাশেদ খান মেনন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও শাজাহান সিরাজের সঙ্গে একতালে চলতে শুরু করে। ফলে দলনেতা সবুর খানের বিরোধিতার মুখে পড়তে হলে সে অপর মুসলিম লীগ সংসদ সদস্য ইব্রাহিম খলিলকে নিয়ে মুসলিম লীগের আলাদা গ্রুপ গঠন করে। সংবিধানে তখনও দলত্যাগ করলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান থাকলেও সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধি না থাকায় সে তা থেকে পরিত্রাণ পায়। আবার যখন এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন, সাকা চৌধুরী তখন তার সঙ্গে ভিড়ে মন্ত্রিসভাতেই জায়গা করে নেয়।

জানা যায়, এ সময় সাকা চৌধুরী ও সালমান এফ রহমান জুটি এরশাদের সঙ্গে মিলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিপুল বিত্তবৈভব সঞ্চয় করে। কিন্তু কূট রাজনীতিতে সিদ্ধ সাকা চৌধুরী এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ক্রোধের বিস্তার দেখে আরেক রাজনৈতিক ফেরেপবাজ আনোয়ার জাহিদকে নিয়ে মন্ত্রিসভা ত্যাগ করে এনডিএ গঠন করে। ঐ এনডিএ-ই পরে এনডিপিতে রূপ নেয় এবং সাকা চৌধুরীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে।

একানব্বইয়ের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর সাকা চৌধুরী আবাররাজনীতির ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে ওঠে। এবারও তার অবস্থান ছিল বিএনপিতে। শেখ হাসিনার সঙ্গে পারিবারিক অতীত সখ্যতার সুযোগ নিয়ে সাকা চৌধুরী বিরোধী দলনেত্রীর অন্যতম উপদেষ্টায় পরিণত হয়। জানা যায়, আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে বিশাল আপত্তি থাকলেও সাকা চৌধুরী দলের অন্যদের সঙ্গে মিলে শেখ হাসিনাকে সংসদ বর্জন ও পদত্যাগে প্ররোচিত করে। লক্ষ্য ছিল দেশে আরেকটি সামরিক শাসন আনা। সেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গণআন্দোলনই সরকার পরিবর্তনের পরিণতি লাভ করে। এবার কিন্তু সাকা চৌধুরী এতদিন হাসিনার সঙ্গে মিলে যে বিএনপির বিরোধিতা করেছে সেই বিএনপিতেই ভিড়ে যায় এবং অচিরেই সেই দলের দক্ষিণপন্থীদের সংগঠিত করে নিজের অবস্থান দৃঢ় করে।

এবারও তার কৌশল ছিল বিএনপিকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করানো। দলের দক্ষিণপন্থীদের জড়ো করে সেই খেলা সাঙ্গও করে ফেলেছিল। কিন্তু দলের ‘নরমপন্থীরা’ বেঁকে বসায় সেটা আর হয়নি। দল থেকে কিছুটা বিচ্ছন্ন হয়ে সাকা চৌধুরী এবার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই নেমে পড়ে। চট্টগ্রামের আবদুল্লাহ আল নোমান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আগে থেকেই তার চোখের বিষ ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই আক্রমণে নামে সাকা চৌধুরী। বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তাকে শেষ পর্যন্ত দল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের সময় বিএনপির পাঁচটি আসনে নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিলে বিএনপি আবার তাকে দলে ফিরিয়ে আনে।

রাজনীতির এই কূট ব্যবসায়ী ব্যক্তি জীবনেও একজন ভয়ঙ্কর ব্যক্তি। মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে তার হাত রক্তাক্ত। আর বাংলাদেশ আমলেও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তার খুনের রেকর্ড অসংখ্য। অবশ্য এর কোনোটাই প্রকৃত তদন্ত বা বিচারের মুখ দেখেনি। যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কানেকশনের কারণে শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া তাদের সম্পর্কে অশালীন কথা বলা ও মন্তব্য করার পরও সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারেননি, এ ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। আওয়ামী লীগ আমলে সাকা চৌধুরীর বাড়ি থেকে তার উপস্থিতিতে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাকা চৌধুরীর কিছুই হয়নি। নিহত ছাত্রদল নেতা নিটলের মৃতদেহ গুডস হিলসের সামনে পাওয়া গেছে। সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এবারও হারিয়ে গেছে। বিএনপি শাসনামলেই তার কোম্পানি কিউসি শিপিংয়ের জাহাজে চোরাচালানোর সোনা ধরা পড়েছে। ওই মামলাও হাওয়া হয়ে গেছে। এভাবেই সব ধরা-ছোঁয়ার বাইরে সাকা চৌধুরীর অবস্থান।
সৌজন্যেঃ সাপ্তাহিক

About riton

Whoa!! Finally you came to this page to know about me? that sounds cool. So here is what i am....... want to know more.... i have a lovely wife whom i love forever....... That's not all about me, i do have a job and a house to live and some food and a bed to sleep in.....and I love blogging! Good Luck!!!!
This entry was posted in বিভাগবিহীন and tagged . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>