
‘আর্টহাউস’ সিনেমা বা তথাকথিত শিল্পসম্মত মুভিতে বিতর্কিত চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পাবার পর ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ধর্মীয় দাঙ্গা নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেই আবারো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বলিউড অভিনেত্রী নন্দিতা দাস।
তিন বছর সময় নিয়ে ছবিটির তিনি এর পাণ্ডুলিপি লিখেছেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি চলচিত্র উৎসবে প্রশংসা ও পুরস্কার জয়ের পর এ মাসেই মুক্তি পেয়েছে নন্দিতা দাস পরিচালিত প্রথম ছবি ‘ফিরাক’। ২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে একটি ট্রেনে আগুন লেগে ৫৯ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী মারা যাওয়ার পর সংঘঠিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় আড়াই হাজারেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়। দাঙ্গার সময় একটি পরিবারের ২৪ ঘণ্টার বিবরণের কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। বিষয়টি নিয়ে ৩৯ বছরের নন্দিতা দাসের সঙ্গে কথা বলেছেন রয়টার্সের প্রতিবেদক টনি থ্যারাকান।
নন্দিতার কাছে টনির প্রথম প্রশ্নটি ছিল, ফিরাককে দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করার পরিকল্পনা কি আপনার আগে থেকেই ছিল? উত্তরে নন্দিতা বলেন, না। আসলে ব্যাপারটি তেমন নয়। আমি গত কয়েক বছর ধরেই চলচ্চিত্র পরিচালনার কথা ভাবছিলাম। ভাবিনি ফিরাক আমার পরিচালিত প্রথম ছবি হবে। আসলে ছবিটি আমি পরিচালনা করেছি কারণ এর গল্পই আমাকে নাড়া দিয়েছে এবং আমাকে পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমার মনে হয়েছে আমার চারপাশে যা ঘটছে তা নিয়ে আমার কিছু করা উচিত। সমাজের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের বিরুদ্ধে এটা আমার প্রতিক্রিয়া বলতে পারেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি করা হয়, ছবিটি তো গুজরাট রায়ট নিয়ে নির্মিত? নন্দিতা বললেন, ছবিটি গুজরাটেই চিত্রায়িত হয়েছে। তবে রায়ট চলাকালীন নয়। রায়টের কয়েক মাস পরে। তাছাড়া ছবিতেও কোনো সংঘাত নেই। এখানে শুধু দেখানো হয়েছে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কিভাবে ৫টি সম্পর্ক প্রকাশিত হয়ে যায়। টনি জানতে চাইলেন, সংঘাত নিয়ে নির্মিত ছবিতে সংঘাত দেখানো হচ্ছেনা। ব্যাপারটি অদ্ভূত নয়কি? নন্দিতা বলেন, ছবিটি দেখে অনেকইে মন্তব্য করেছেন, এখানে কোন সংঘাত না থাকা সত্ত্বেও ভয়, চিন্তা ঠিকই অনুভব করা যায়। ঘরের বাইরে যে সংঘাত চলছে, মানুষের জীবনে যে সংঘাত চলছে তা অনুভব করা যায়। আমি আসলে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়েছি, মানুষের মনে ও সম্পর্কে কী ধরণের পরিবর্তন হয়, এবং সংঘাত আমাদের কিভাবে প্রভাবিত করে তার ওপর।
ফিরাককে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতমূলক বলে সমালোচনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে নন্দিতার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিপরীত কথা বলছে এমন হাজার হাজার ই-মেইল এবং ম্যাসেজ আমার কাছে আছে। অনেকেই বলেছে, তাদের মনে এটি পুরোপুরি মানবিক গল্প। অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মিল পেয়েছেন এখানে। তবে হ্যাঁ। অনেকই এটাকে একপক্ষীয় গল্প বলেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই। বাস্তবই তো একপক্ষীয়। আমরা সবাই জানি যে, দাঙ্গায় মুসলিমরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাস্তব তো আর আমরা বদলে দিতে পারি না।
ফিরাকের মত একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা কঠিন মনে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নন্দিতা বলেন, আসলে ছবিটি আমার কাছে ছিল ক্যাথারসিসের (আবেগের অবমুক্তি) মত। এর মাধ্যমে আমি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পেরেছি। আর এ কারণেই ছবিটি নির্মাণ আমার জন্য কঠিন ছিল। এরপর টনি জানতে চান, ফিরাকে অভিনয় করার পরিকল্পনা নন্দিতার ছিল কিনা। উত্তরে নন্দিতা বলেন, শুরুতে এমন পরিকল্পনা ছিল না। কারণ আমার মনে হয়েছে একই সময়ে ক্যামেরার সামনে ও পেছনে থাকা কঠিন। কিন্তু পরে দেখলাম এ ধরনের চরিত্রে কেউ অভিনয় করতে সাহস করছেন না।
আর সবাই বলছিলেন, আমারই এখানে অভিনয় করা উচিত। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ অন্তত প্রথম ছবিতে পুরোপুরি ভাবে পরিচালনায় মনোনিবেশ করা উচিত। নন্দিতার কাছে জানতে চাওয়া হল, এরপর কী? অভিনয় নাকি পরিচালনা। নন্দিতার উত্তর হল, আমি অভিনয় করার জন্য ইতোমধ্যেই একটি প্রজেক্টে স্বাক্ষর করেছি। তবে ভবিষ্যতে আরো চলচ্চিত্র পরিচালনা করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু এখন আমার নিজের জন্য কিছুদিন বিশ্রাম দরকার।
রয়টার্সে নন্দিতা দাসের সাক্ষাতকার
This entry was posted in বিভাগবিহীন and tagged Nandita das. Bookmark the permalink.
