‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’
এবারের গোল্ডেন গ্লোব প্রতিযোগিতাটি ভারতের জন্য নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের এক অসাধারণ সঙ্গীত প্রতিভা এখানে পুরষ্কার জিতে নিজের দেশবাসীকে খুশির জোয়ারে ভাসাচ্ছেন। তার সুর করা ছবি পাঁচ পাঁচটি বিভাগে জিতে নিয়েছে পদক। সে সিনেমাতে সংগীত পরিচালনা করে প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই ১১ জানুয়ারি দারুণ সম্মানীয় গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জিতেছেন আল্লা রাখা রহমান ওরফে এ আর রহমান। পুরস্কার পেয়ে সাথে সাথে সেটাকে এক বিলিয়ন ভারতীয়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দিতে ভোলেননি তিনি। মুম্বাই গত কয়েক মাসের অনেক খারাপ ঘটনার পরে এরকম ঘটনা শোনাটা নিশ্চয়ই আনন্দের।
নিজে পুরস্কার জিতেছেন এটা তো আনন্দেরই। আবার আরেকটা গর্বের ব্যাপারও আছে তার জন্য। যে সিনেমাতে তিনি সংগীত পরিচালনা করলেন, সেই ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ গোল্ডেন গ্লোবে মনোনয়ন পেয়েছিল ছয়টি ক্যাটাগরিতে। এর মধ্যে পুরস্কার জিতে নিয়েছে পাঁচটিতেই। ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’- এর গল্পটা এক ভারতীয়ের লেখা। পটভূমিটাও ভারতীয়। বিকাশ স্বরূপের লেখা উপন্যাস ‘কিউ এন্ড এ’ অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখেছেন নামজাদা লেখক সিমন বুফেঁ। সিনেমাটির সহকারী পরিচালকও একজন ভারতীয়। নাম লাভলিন ট্যান্ডন। তেলুরিদ আর টরেন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পরে সিনেমাটি আমেরিকায় সীমিত আকারে মুক্তি পেয়েছিল গত বছরের ১২ নভেম্বর।
গল্প
সিনেমাটি মুম্বাই শহরের বস্তিবাসী এক তরুণকে নিয়ে। মুম্বাই শহরের টোকাই ছিল জামাল মালিক। তাকে পুলিশ জেরা করে চলেছে। জামাল হচ্ছে জনপ্রিয় টিভি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র একজন প্রতিযোগী। তার বিরুদ্ধে আছে প্রতারণার অভিযোগ। প্রতিযোগিতায় এত সব প্রশ্নে উত্তর সে কিভাবে দিল তাই নিয়ে সন্দেহের অবতারণা। কঠিন পুলিশী জেরার সূত্রে জামালের জীবনকাহিনী বেরিয়ে আসে। সে বৈচিত্র্যময় কাহিনীতে আছে অমিতাভ বচ্চনের অটোগ্রাফ সংগ্রহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মায়ের মৃত্যু, লতিকা নামে এক এতিম মেয়ের সাথে ভাই সেলিমের বন্ধুত্বসহ আরো অনেক কিছু।
বস্তিতে থাকতেই সন্ত্রাসী মামানের সাথে পরিচয় হয় জামাল আর সেলিম নামের এই দুই ভাইয়ের। মামান একটা এতিমখানা চালানোর নামে শিশুদের ধরে ভিক্ষা করিয়ে টাকা আনতে বাধ্য করে। সেলিম প্রথমে এই সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়ে। তাকে বলা হয় জামালকেও নিয়ে আসতে হবে। অন্ধ শিশুরা গান গেয়ে ভিক্ষা করলে বেশি টাকা পায়। তাই ঠিক করা হলো- জামালকে অন্ধ করে দেয়া হবে। সেলিম এ পরিকল্পনা শুনে বিদ্রোহ করে বসে। তিনজন মিলে এতিমখানা থেকে পালায় ওরা। লতিকা, সেলিম আর জামাল। কিন্তু লতিকা ধরা পড়ে আবার ফিরে যায় এতিমখানায়। তাকে গড়ে তোলা হয় প্রতিভাবান দামী পতিতা হিসেবে।
এদিকে দুই ভাই ট্রেনের ছাদে চড়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। ফেরি করে, তাজমহলের গাইডের ভান করে মানুষের পকেট কাটে। জামালের ইচ্ছে মুম্বাইতে গিয়ে লতিকাকে খুঁজে বের করার। তার পীড়াপীড়িতেই দুই ভাই আবার ফিরে আসে মুম্বাইতে। লতিকাকে এক পতিতাপল্লীর নর্তকী হিসেবে দেখতে পায় ওরা। চেষ্টা করে তাকে উদ্ধারের। মামান এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। বিরোধের এক পর্যায়ে সেলিম গুলি করে মারে মামানকে। এই কৃতিত্ব দিয়ে মামানের বিরোধী পক্ষের আরেক সন্ত্রাসী নেতা জাভেদের অধীনে কাজ জুটিয়ে নেয় তারা। কিন্তু এই ভাইদের ভালোবাসায় একসময় চিড় ধরে। কারণ সেলিম দাবি করে লতিকা তার। জামাল প্রতিবাদ করে। প্রেমান্ধ সেলিম আপন ভাইকে খুন করার হুমকি দেয়। সমাধান দেয় লতিকাই। সে বেছে নেয় সেলিমকে।
বছর খানেক পরের ঘটনা। জামাল একটা কল সেন্টারে চা সরবরাহের কাজ করে। সেলিম ততদিনে জাভেদের দলের বড় ক্যাডার। সে জামালকে তাদের সাথে এসে থাকতে আমন্ত্রণ জানায়। সেলিমকে অনুসরণ করে জামাল পৌঁছায় জাভেদের বাসায়। সেখানে দেখতে পায় লতিকাকে। হাঁড়ি- পাতিল ধোয়ার কাজ করার ছলে লতিকার সাথে দেখা করে সে এবং নিজের সাথে পালানোর পরামর্শ দেয় তাকে। লতিকা জামালের এই আবেগী উদ্যোগকে মেনে না নিলেও কথা দেয় প্রতিদিন বিকেল ৫ টায় রেল স্টেশনে যাবে এবং তারা একে অন্যের সাথে দেখা করবে। কিছুদিন এই অবস্থা চলার পরে জাভেদের লোকজন টের পেয়ে যায় ব্যাপারটা। ভয় লাগাতে লতিকার চিবুকে ছুরির আঁচড় কেটে দেয় ওরা। জাভেদ আরেক বাসায় উঠে গেলে জামাল আবার লতিকার যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে।
লতিকাকে আবার খুঁজে বের করতেই জামালের মাথায় আসে টেলিভিশনের কোনো প্রোগ্রামে হাজির হওয়ার পরিকল্পনাটির কথা। বিশেষ করে গেইম শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’- এর কথা সে একারণেই ভাবতে শুরু করে যে, সে জানে লতিকা এটা মনোযোগ দিয়ে দেখে। অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের প্রবল অপছন্দের পরেও সে পৌঁছে যায় চূড়ান্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে। সে পর্বের শুটিং চলাকালে যখন বিশ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার জন্য আর মাত্র একটি প্রশ্ন বাকি তখন তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
কিভাবে তার মতো এক সামান্য বস্তির ছেলে এতো প্রশ্নের উত্তর জানলো এটা বের করতে তারা নির্যাতন শুরু করলো। জামাল জানায় তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই জেনেছে সে এসব প্রশ্নের উত্তর। ব্যাখ্যা শুনে পুলিশ ইন্সপেক্টর ‘হতেও পারে’ ভেবে তাকে চূড়ান্ত প্রশ্ন পর্বে স্টুডিওতে ফেরত পাঠান।
জাভেদের আস্তানায় বসে লতিকা দেখে জামালের নাটকীয়ভাবে ফিরে আসা। সেখানে সেলিম লতিকাকে গাড়ির চাবি আর তার ফোনটা দিয়ে দেয় পালানোর জন্য। আর চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে একটা সুযোগ থাকে বন্ধুকে ফোন করার। জামাল ফোন করে সেলিমকে। ফোন ধরে লতিকা। আবার সংযোগ হয় দুজনের। লতিকাও জানতো না প্রশ্নের উত্তর তবে তার বিশ্বাস এটা কোথাও লেখা আছে। জামাল সঠিক উত্তরটা আন্দাজ করে নেয়। থ্রি মাস্কেটিয়ারদের একজনের নাম সম্পর্কিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে বলে দেয়- ‘আরামিস’। আর এ সময়ই সন্ত্রাসী জাভেদ টের পায় লতিকাকে পালাতে সাহায্য করেছে সেলিম। এই নিয়ে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে সেলিম জাভেদকে গুলি করে মারার পর নিজেও বাথটাব ভর্তি টাকার মধ্যে খুন হয়ে যায়। আর অন্যদিকে সেই ভয়াবহ রাতে রেল স্টেশনে বহুদিন পরে আবার জামাল আর লতিকার মিলন হয়। এখানেই শেষ হয় ছবিটি।
আলোচনা আর সমালোচনা
সমালোচকদের মন জয় করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’- কে। সিমন বুফেঁর টানটান আর দারুণ মজার চিত্রনাট্যে সবাই বিমোহিত। ক্যামেরায় এক হাত দেখিয়েছেন অ্যানথনি ডড-ও। ক্রিস ডিকেন্সের সম্পাদনাকে বলা হচ্ছে- শ্বাসরুদ্ধকর। যে জায়গাকে নিয়ে এই ছবি, সে জায়গার সাথে কোনভাবেই যুক্ত ছিলেন না এর পরিচালক। কিন্তু সিনেমা করতে গিয়ে ‘যুক্ততা’ তৈরি করেছেন আশ্চর্য শৈল্পিক ভঙ্গিতে। লস এঞ্জেলস টাইমস- এর মতে, “হলিউডি মেলোড্রামা মার্কা রোমান্টিক ছবির বাইরে গিয়ে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ তারকা বর্জিত এক অবিস্মরণীয় ছবি।” আর নিউ ইয়র্ক টাইমস সিনেমাটিকে বলেছে, “আধুনিক রূপকথা।” অবশ্য সেখানে ছোট সমালোচনাও যোগ করে বলা হয়েছে, সিনেমাটিতে যতো বেশি মানব মনের কান্না শোনা গেছে সেটা ছাপিয়ে উঠেছে পরিচালকের যান্ত্রিক বিবেচনা। এরকম কিছু বিরূপ সমালোচনাও জুটেছে সিনেমাটির কপালে। যেমন সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকল বলছে, “সিনেমাটির গল্প বলার ধরণে সমস্যা আছে। গল্পটা সিনেমার শেষ ৩০ মিনিটের আগে জমিয়েই তোলা যায়নি।” আর সিনেমা ব্লেন্ড তো স্লামডগ মিলওনেয়ার -এর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর অভিযোগ নিয়ে এসেছে। বলেছে, ভারতীয়দের দেখানোর ভঙ্গি এখানে সঠিক হয়নি।
দ্য মেকিং অব ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’
স্লামডগ মিলিওনেয়ার-এ জামাল মালিকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ডেভ প্যাটেল। তাকে ঐ চরিত্রে পছন্দ করেন পরিচালক বয়েলের ১৭ বছরের মেয়ে এক টিভি সিরিয়ালে দেখে। ফ্রিডা পিন্টো করেন লতিকা চরিত্রটি। এটাই তার প্রথম সিনেমায় অভিনয়। ভারতীয় বলিউড তারকা অনিল কাপুর টিভি শো- এর উপস্থাপকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এই ছবির চিত্রনাট্য লেখার জন্য বুফেঁ গবেষণা করেছেন বিস্তর। ভারতে ঘুরে গেছেন বার তিনেক। রাস্তার টোকাইদের ধরে ধরে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। বস্তিবাসী শিশুদের অফুরন্ত প্রাণশক্তির উৎস সন্ধানে একেবারে হন্যে হয়েছিলেন তিনি। ২০০৬ সালের শুরুতে বৃটেনের সিনেমা কোম্পানি ‘সিলাডর ফিল্মস’ পরিচালক ডেভিড বয়েল- কে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’- এর চিত্রনাট্য পড়ে দেখার আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন বয়েল। কারণ ‘হু ওয়ান্টস টু বি এ মিলিওনেয়ার’ জাতীয় কোন গেম শো- এর ওপর সিনেমা বানাতে আগ্রহী ছিলেন না তিনি। কিন্তু চিত্রনাট্যকারের নাম তাকে নতুন করে ভাবায়। কারণ বুফেঁর দারুণ ভক্ত তিনি।
ফলে পরিচালক রাজী হয়ে যাবার পর এই সিনেমাটির বাজেট হলো ১৫ মিলিয়ন ডলারের। ছবির ইউনিট প্রথম ভারতে এলো ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। লাভলিন ট্যান্ডন তখন দায়িত্বে আছেন ছবির সংলাপগুলোতে হিন্দি ভাষার ছোঁয়া লাগানোর। তার কাজের ফলে এই চিত্রনাট্যের প্রায় ১০ ভাগ সংলাপ হিন্দিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর সবকিছু শেষে এই ছবিটির শুটিং শুরু হলো ২০০৭ এর ৫ নভেম্বর। এর পরের কাহিনী তো সবারই জানা!
তথ্যঃ ওয়েবসাইট।

Excellent movie. I recmd each and everyone to watch this movie. And of course A.R. Rahman music as always the best. Congratz to Rahman. Thanks for sharing this story dada.
ki ki bhalo laglo setato janali na, ekek joner drishtibhonge ekek rokom hoyar kotha taina. tor ki ki bhalo laglo jana.
i love this movie…
khub nice kore dekhano holo…every answer gulo….
The Boy’s acting…
Choto cheleta…AB r Autograph nebar jonno lolzzzz
Really an excellent movie….